নবম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা বই ছাপার পরই প্রয়োজন হয়েছে তার প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপনের। শুরুর যুগে হেঁকেডেকে বেচার থেকে শুরু করে হালফিলের সমাজমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের পথ পেরোতে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর, বদলেছে অনেক বয়ানকৌশল। সেই বদলের ইতিহাস শুধু বইয়ের বাণিজ্যের কৌশল হিসাবে বাঁধাধরা গতের বাঁকবদলের বয়ান নয়, আমাদের জীবনচর্যার ধারাভাষ্যও বটে। ...
বই লেখার পর তা মুদ্রণ উপযোগী করে শুধু ছাপলেই হবে না, তাকে বাজারজাত করতে হবে, তার পরিবেশনা ও বিপণনের বন্দোবস্তও জরুরি। পুথির যুগে লিপিকর বিশেষ ফরমাশে উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে পুথি লিখতেন। রাজাবাদশাদের ছিলেন লেখার বা আঁকার বেতনভুক কর্মচারীরা। কিন্তু বিচল হরফে মুদ্রণের শুরুয়াতে বদলে গিয়েছিল সব পরিকাঠামো। ১৪৩৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে গুটেনবার্গ বাইবেল ছাপার পর অন্যান্য দেশেও ছাপা শুরু হয়। ১৪৭২-এ ক্যাক্সটনের বাইবেল সংক্রান্ত ইংরিজিতে হ্যান্ডবিল ছাপানোকে বইয়ের বিজ্ঞাপন ছাপা শুরুর সোপান হিসাবে মনে করা হয়। তবে বইয়ের বিজ্ঞাপন শুধু মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হত, তা নয়। হেঁকেডেকে বিজ্ঞাপন ও বিক্রি দুইই চলত। আমাদের এই বঙ্গদেশে ঝাঁকায় করে বই নিয়ে গেরস্তের বাড়ি বাড়ি কিংবা হাটে হেঁকে বিজ্ঞাপন এবং বিক্রির কথা শোনা যায়। ছাপা শুরুর আগে হাতে-লেখা পুথির যুগে মৌখিক প্রচারই ছিল মূল ভরসা। বাংলা বিচল হরফে ছাপার সূচনা যে বইটির মাধ্যমে হয় সেই হালেদের গ্রামার মুদ্রণের আগে বিজ্ঞাপন-বিপণনের ব্যবস্থা পাকা করতে লেখক স্বয়ং ছিলেন বিশেষভাবে উদ্যোগী। তিনি হেস্টিংসের অনুরোধে যখন বইটি লিখতে শুরু করেন তখন নানাভাবে সাহায্যের আশ্বাস পেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে সাহায্য করেছিলেন হেস্টিংস ব্যক্তিগত উদ্যোগেও, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশীয় ভাষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে শাসন-শোষণ সম্ভব হবে না। হেস্টিংসের এই কূটনৈতিক উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ছাপা বইটির খরচ ছিল বইপিছু ৩০টাকা (মনে রাখতে হবে সেযুগে টাকায় ২২সের চাল পাওয়া যেত)। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে হালেদ জানতেন নিজে তদ্বির না-করলে প্রাপ্য টাকা বই ছাপার পর পাওয়া যাবে না। তাই পরিকল্পনা, ছাপার প্রস্তুতি ও ছাপা চলাকালীন তিনি প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য উদ্যোগী হয়ে দরবার করেছেন। এমনকি নিজের বইয়ের প্রচারের জন্য, ততদিন অবধি ছাপা ‘Preface’ অংশের অল্পসংখ্যক কপি নিয়ে বইটির প্রাথমিক নমুনা তিনি কর্তৃপক্ষ, লক্ষ্য-পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের সামনে হাজির করেছিলেন। সেযুগের এই বিপণন-কৌশল বর্তমান বিপণন-প্রকরণের থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিল বলে মনে হয় না।
...
এরপর ধীরে বিচল বাংলা হরফে প্রকাশনা চলতে থাকে। সেকালে যে সংবাদপত্রগুলি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হত তাদের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল বিজ্ঞাপন ছাপানো। হিকির ‘গেজেট’-এর নামের সঙ্গে ‘এডভারটাইজার’ কথাটি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল (‘হিকি’স বেঙ্গল গেজেট বা অরিজিনাল ক্যালকাটা জেনারেল এডভারটাইজার’)। নামের সঙ্গে সাজুয্য রেখে এখানে ছাপা হত নানাধরনের প্রচুর বিজ্ঞাপন। পরবর্তী সময়ে ইংরিজি কাগজে বাংলা বিজ্ঞাপনও ছাপা হত।
উনিশ শতকের শুরু থেকে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে যে মুদ্রণযজ্ঞের সূচনা করেন তা ছিল ফলপ্রসূ। শুধুমাত্র খ্রিস্টধর্মের বই নয়, ছাপা হয়েছিল নানা বিষয়ের বই, বহুভাষায়। পঞ্চানন কর্মকার ও তাঁর উত্তরসূরিদের দক্ষতায় বলীয়ান মিশনারিদের মুদ্রণব্যাপ্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই ধারায় ১৮১৮-র ২৩ মে প্রকাশিত হয় জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় সাপ্তাহিকপত্র ‘সমাচার দর্পণ’। সেই সঙ্গে শুরু হয় বাংলা বইয়ের বিজ্ঞাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সংবাদপত্রে সেকালের কথা-য় ‘সাহিত্য’ অংশে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একত্রিত করেছেন ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রকাশিত বেশ কিছু বইসংক্রান্ত খবর। এগুলোকে বিজ্ঞাপন বলা হবে কিনা এ চিন্তা মাথায় ঘুরলে এ বিষয়ে গৌতম ভদ্রের মহাগ্রন্থ ন্যাড়া বটতলায় যায় ক’বার-এ উদ্ধৃত ‘বিজ্ঞাপন’ শব্দটির উনিশ শতকি অভিধানে ছাপা অর্থ আমাদের ধূসর বস্তুতে নাড়াচাড়া করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। উইলিয়াম কেরির বাংলা-ইংরাজি অভিধান অনুসরণ করলে বলা যায়, ‘জানাবার বা বোঝাবার জন্য কিছু ছাপলেই সেটাকে বিজ্ঞাপন বলতে কোনো বাধা নেই’। ১৮৫৪-র উদয়চরণ আঢ্যের ত্রৈভাষিক অভিধান মোতাবেক ‘advertisement’ ইংরিজি শব্দটির তৎকালীন চালু বাংলা অর্থ ‘সমাচার, সম্বাদ’। এই অর্থ অনুসরণে বলাই যায়, ‘সমাচার দর্পণ’-এ ছাপা বইসমাচারগুলি এক অর্থে বিজ্ঞাপনই—বিশেষ রূপে জ্ঞাপন ছাড়া অন্য কিছু তো হচ্ছে না। যেমন ধরা যাক, ২৫ জুলাই ১৮১৮-য় খবর বেরয় ইংরিজি অভিধানের মতো নানার্থ দিয়ে ‘উত্তম অক্ষরে’ ছাপা এক ৮৯২ পাতার কেতাবের চারশোটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর ‘শেষ এক শত আছে ছয় তঙ্কা মূল্যে’, ইচ্ছুক ব্যক্তিরা উত্তরপাড়ার দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে বা কলকাতায় রামমোহন রায়ের ‘সৈসোয়িটী অর্থাৎ আত্মীয় সভাতে’ পাবেন। সংক্ষেপে বইয়ের প্রকার থেকে শুরু করে দাম এবং কোথায় পাওয়া যাবে তা বলা রয়েছে। সঙ্গে চারশো কপি বিক্রি হওয়ার যে সংবাদ-লেজুড় রয়েছে তা নিঃসন্দেহে পাঠক-ক্রেতার আগ্রহ বাড়াবে। বাঙালির তখন ইংরিজি শিক্ষা জরুরি, তাই ছাপা হত সহজে ইংরিজি শিক্ষার বই। যেমন ৩ অক্টোবর ১৮১৮ ‘দর্পণ’-এ খবর বেরল এক আদর্শ পুস্তকের যা ‘পড়িলে ইংরেজী বিদ্যা সহজে হইতে পারে’, ‘চামড়া বন্ধ জেল্দ করা ইহার মূল্য ফি কেতাব ৩ টাকা’; ইচ্ছুক ব্যক্তিরা কলকাতায় ‘শ্রীগঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্যের আপীসে কিম্বা মোং শ্রীরামপুরের কাছারি বাটীর নিকটে শ্রীজান দেরোজারু সাবেহের বাটীতে তত্ত্ব করিলে পাইতে পারিবেন’। শ্রীগঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্যের নামটা চেনা লাগছে—সম্ভবত সেই ‘বাঙ্গাল গেজেটি’র প্রকাশক বা প্রথম সচিত্র বাংলা বইয়ের মুদ্রক গঙ্গাকিশোরের কথাই এখানে বলা হয়েছে। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৮১৯ বই-ছাপানো নিয়ে যে খবর বেরয় তা থেকে আমরা জানতে পারি, তার আগের দশ বছরে আনুমানিক দশহাজার বই ছাপা হয়ে গেছে এবং বই বিলিবিক্রির ফলে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এবং যিনি একবার বই কিনেছেন তাঁর আবার অন্য বই কেনার ইচ্ছা জন্মেছে, সেটাও জানানো হয়েছে। ৫ জুন ১৮১৯-এ ‘নূতন পুস্তক’ শিরোনামে জানানো হয়েছিল শ্রীযুত বাবু রামকমল সেনের হিন্দুস্থানী ছাপাখানায় মুদ্রিত ঔষধসারসংগ্রহ-এর খবর। ছাপ্পান্ন প্রকার ওষুধের বর্ণনা ও কোন উপসর্গে তা খেতে হবে সে বিবরণ ছিল এই বইতে। প্রকাশিত হত ধর্মপুস্তকের খবরও—যেমন ১৯ জুন ১৮১৯-এ ছাপা হয় জগন্নাথদেবের বিবরণসহ জগন্নাথ মঙ্গল নামক নতুন পাঁচালির খবর, বা ৪ সেপ্টেম্বর ১৮১৯-এ সাড়ে চারটাকা দামের ‘শ্রীভগবদগীতা’র খবর। বিতর্ক উঠেছিল সহমরণ নিয়ে—থাকত রামমোহনের সহমরণ বিষয়ের বইয়ের সংবাদ আবার সহমরণবিধায়ক অপরাপর প্রকাশনার বৃত্তান্ত। পাঁজি, অভিধান, জ্যোতিষবিষয়ক বই—কিছুই বাদ ছিল না। পাশাপাশি শ্রীরামপুর মিশনারিদের ছাপা বইয়ের খবরাখবর নামদামসহ মিলত ‘সমাচার দর্পণ’-এর পাতায়।
সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছেপে লেখক-প্রকাশক ইতিবাচক ফল পাওয়ায় পরবর্তী সময়ে যেসব সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে সেগুলিতে অন্য অনেক কিছুর মতো বইয়ের বিজ্ঞাপনও জায়গা করে নেয়। বলতে গেলে এই খবরের কাগজগুলিই হয়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের মূল আধার। কলিকাতা কমলালয়-এর লেখক ও ‘সমাচারচন্দ্রিকা’-সম্পাদক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রীমদ্ভাগবত বইটির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে বইটি যে শুধু বড়ো বড়ো অক্ষরে ‘তুলাত’ কাগজেই ছাপা হয়েছিল বলে ছেড়ে দেননি প্রকাশক, যোগ করেছেন ‘চন্দ্রিকাযন্ত্রে ব্রাহ্মণদ্বারা মুদ্রাঙ্কিত’—যা তাঁর মনে হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত-এর পাঠক—জাতপাতের জালে আচ্ছন্ন লক্ষ্য-ক্রেতাকে—আকর্ষণ করবে।
সেযুগেও কোনো বইয়ের বিপুল কাটতির লোভানি দিয়ে আকর্ষণ করাও ছিল একটা রেওয়াজ, যেমন ১৮৫৩-তে নীলমণি বসাক আরব্য উপন্যাস-এর বাংলা অনুবাদের দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপার সময় তাঁর সাফল্য নির্লিপ্ত বয়ানে বিজ্ঞাপনরূপে ভূমিকায় তুলে ধরেন—“এই পুস্তক মুদ্রাঙ্কিত হইলে বর্তমান রীত্যনুসারে দ্বারে দ্বারে চাঁদার বহি প্রেরণ অথবা ক্রয় জন্য কাহাকে অনুরোধ না করিয়া পুস্তক সকল সাধারণ বিক্রয়ালয়ে বিক্রয়ার্থ অর্পণ করা গিয়াছিল, যাহার প্রয়োজন হইয়াছে সেই স্থান হইতে ক্রয় করিয়া লইয়াছেন। ইহাতে অল্পদিন মধ্যে সকল পুস্তক শেষ হইয়া গিয়াছে। শুনা যায় ইংরাজ, মুসলমান ও বাঙ্গালী প্রভৃতি নানা জাতীয় লোক, এবং কোন কোন স্ত্রীলোক, বিশেষতঃ যাহারা কখনই পুস্তক হস্তে করেন না তাঁহারাও এই পুস্তক ক্রয় করিয়া পাঠ করিয়াছেন, ইহা সামান্য আহ্লাদের বিষয় নয়।”
বিজ্ঞাপনে যেমন বিশেষ কাগজে ছাপা, বিশেষ জাতের লোকের ছাপার কথা লেখা হত, তেমনই উল্লেখ করা হত ত্রুটিমুক্ত মুদ্রণের বা সুন্দর হরফে ছাপার কথা। আবার কোনো বইয়ের মান বিচার বিশেষ কোনো পত্রিকায় প্রশংসিত বা নাটকের বইয়ের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ থিয়েটারে অভিনয় হচ্ছে বলে ঘোষণা করার উদাহরণও রয়েছে। এমনকি রয়েছে ‘মনে না ধরিলে পুস্তক [সমুন্নত সাহিত্য প্রকাশ কার্য্যালয় মুদ্রিত ‘গোপাল ভাঁড়’ গল্প] ছিঁড়িয়া খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেরত পাঠাইবেন। মূল্য ফেরত দিব।’—এমন প্রতিশ্রুতিও।
সেকালে বইব্যাবসা সেভাবে জমে ওঠার আগে ছিল না তেমন বইবিপণীও। তাই বই বিক্রির জায়গা ছিল প্রেস, প্রকাশকের অফিস ও বাড়ি কিংবা লেখকের কর্মস্থল বা আবাস। সেখবর দেওয়া থাকত বিজ্ঞাপনে। তাছাড়াও বইতেই সরাসরি উল্লেখ করা হত লেখকের অন্যান্য বই বা প্রকাশনার অন্য বইয়ের কথা। স্বয়ং হুতোম প্যাঁচা তাঁর নকশার সঙ্গে সেঁটে দিয়েছিলেন তাঁর বইয়ের প্রাপ্তিস্থানের খবর—“হুতোম প্যাঁচা লিখিত পুস্তক সকল আবশ্যক হইলে দরজীপাড়া গুলু ওস্তাগরের লেনে বসু কোম্পানির ২২নং ভবনে, পুরাণ সংগ্রহ যন্ত্রে শ্রীযুক্ত রাধানাথ বিদ্যারত্ন মানিকতলা শিবতলাস্থ শ্রীযুক্ত বাবু মধুসূদন মুখোপাধ্যায় তথা বাগমারীর গোপীনাথ চক্রবর্তীর নিকট ও ভাস্কর, পরিদর্শক ও প্রেসিডেন্সী যন্ত্রে অনুসন্ধান করিলে পাইবেন। এতদ্ভিন্ন সহরের প্রায় সমস্ত পুস্তকালয় ও বটতলায় শ্রীযুক্ত বাবু বেণীমাধব দে তথা বাবু রাধামাধব শীল প্রভৃতির দোকানেও বিক্রীত হইয়া থাকে।”
এর সঙ্গে সঙ্গে উনিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে সংবাদপত্রের পাশাপাশি পাঁজি ও সাময়িকপত্রগুলি হয়ে ওঠে বইয়ের বিজ্ঞাপনের অন্যতম প্রকাশ মাধ্যম। পাশাপাশি বাঙালির অন্যতম বড়ো উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে নানা উৎসাহ-উদ্দীপনা, সাহেব-তোষণ, বাইজিনাচ, প্রভৃতির পাশাপাশি শুরু হয়েছিল প্রকাশনারও শারদীয় উদ্যাপন বিশেষ সংখ্যা ছাপার মাধ্যমে। বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল ‘সুলভ সমাচার’-এ ১ আশ্বিন ১২৮০ সালে—
“বিজ্ঞাপন।
ছুটির সুলভ!!
আগামী ছুটি উপলক্ষে সুলভের বিশেষ একখণ্ড বাহির হইবে। উত্তম কাগচ, উত্তম ছাপা। দাম কিন্তু ১ পয়সা।
মজা করে পড়িতে পড়িতে ঘরে যাও। একটা পয়সা দিয়ে সকলের কিনিতেই হইবে। দেখ যেন কেউ ফাঁকি পোড় না!”
পরের মঙ্গলবার ৮ আশ্বিন ১২৮০, আবার বিজ্ঞাপন বেরল, পরের বৃহস্পতিবার ‘ছুটির সুলভ’ প্রকাশের খবর নিয়ে—
“বিজ্ঞাপন।
ছুটির সুলভ!!
আগামী বৃহস্পতিবার “ছুটির সুলভ” বাহির হইবে। কেমন সুন্দর কাগজ, কেমন পরিষ্কার ছাপা, কেমন মজার ছবি, অথচ কেমন সস্তা দাম! ছেলে বুড়ো সকলেই মজা করিয়া ছুটির সুলভ পোড় দেখ যেন কেউ ফাঁকি পোড় না। যদি কেহ না ক্রয় কর, আমরা বলিব—উঃ কি কৃপণ একটা পয়সায় মা বাপ! কত মজার মজার কথা!!”
মজার বইয়ের পাশাপাশি উনিশ শতকে প্রকাশিত হয়েছিল বহু গুরুত্বপূর্ণ বই। ছাপা অক্ষরে উন্মেষ ঘটেছিল নানা সাহিত্যধারার, সেগুলি বিকশিত হয়েছিল বিশ শতকে। তাদের স্রষ্টা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের মতো সাহিত্যপ্রতিভা। এঁদের আঁতুড়ঘর রূপে ‘বঙ্গদর্শন’, ‘বালক’, সাধনা’, ‘হিতবাদী’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘শনিবারের চিঠি’ প্রভৃতি সাময়িকপত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই পত্রিকাগুলিতে এঁদের রচনার পাশাপাশি থাকত অন্য বহু বইয়ের বিজ্ঞাপনও। সাহিত্যগুণে পত্রিকা উন্নত হলেও বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য অবশ্য ছিল একই—বইয়ের খবর লক্ষ্য-পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মূলগত বিষয় এক থাকলেও পরিবর্তন হয়েছিল ভাষা, উপস্থাপনা ও মুদ্রণ কৌশলের। বইয়ের বিজ্ঞাপন যেমন বেরত, তেমনই বেরত বইসংবাদ ‘ভারতবর্ষ’ ‘প্রবাসী’ ‘শনিবারের চিঠি’ ইত্যাদির পাতায়। বইয়ের খবর বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের জন্য একটি মাশুল অবশ্যই দিতে হত—এককালীন বেশি সংখ্যার জন্য বিজ্ঞাপন দিলে ছিল বিশেষ ছাড়ের সুযোগ। উদাহরণ রূপে ১৩১৬-র ভাদ্র সংখ্যার ‘প্রবাসী’ থেকে তুলে দেওয়া হল বিজ্ঞাপনের মূল্যের তালিকা।
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বইকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে নব্বই বছর ধরে সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’ এক অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ছোটো বড়ো হাফ-পেজ ফুল-পেজ নানা আকারের বিজ্ঞাপন ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপতে লেখক বা প্রকাশকরা এগিয়ে এসেছেন। বহু পরে ‘বইয়ের দেশ’ও প্রকাশ করেছে একই সংস্থা। সিগনেট প্রেসের মতো সংস্থা তার আগে প্রকাশ করেছে ‘টুকরো কথা’—যা আজ ইতিহাস। বর্তমানে এই ডিজিটাল যুগে মুদ্রিত মাধ্যমেও বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় সংবাদ-সাময়িকপত্রে। প্রচার চলে দূরদর্শনের মাধ্যমে, হোর্ডিং, ব্যানার, পোস্টার কিংবা লিফলেট বিলির সাহায্যে। তবে বর্তমানে সবথেকে জনপ্রিয় ও কার্যকর বিজ্ঞাপনের মাধ্যম সমাজমাধ্যম। সেখানে পুরোনো থেকে নতুন সবরকম বইয়েরই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সাড়াও পড়ে বেশ। পাশাপাশি ক্রেতাও সরাসরি কমেন্ট ও মেসেজ মাধ্যমে দরকারি কথা জেনেবুঝে নিতে পারেন প্রকাশক-লেখকের কাছ থেকে, জানাতে পারেন তাঁর খেদ বা ভালো লাগা। ভাগ করে নিতে পারেন তাঁদের অনুভূতির কথা সমাজমাধ্যমের নিজের ওয়ালে বা কোনো গ্রুপে। এর পুরোটাই নিখরচায়—কিছু কিছু ক্ষেত্রে খরচ করে বিজ্ঞাপনের ব্যাপ্তি বাড়ানো যায়।
বর্তমান সংখ্যায় বাংলা বইয়ের বিপুল বিজ্ঞাপনের বিবিধ ক্ষেত্রের খুবই সামান্য অংশ তুলে ধরা হল। পুরোনো পত্রপত্রিকা অনেকই অধরা। যা ধরা দেয় তারও বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো বাঁধানোর সময় ব্যয়সংকোচের কারণে বাদ পড়েছে। প্রতি বছর প্রকাশনা সংস্থার বিলি করা বইয়ের তালিকাগুলো মহা আনন্দে সংগ্রহ করলেও আজ কোথায় অজ্ঞাতবাসী হয়েছে, তা জানা দায়। হারানোর ভয় থাকা সত্ত্বেও ‘৯রিকাল বুকস’ ২০১৭ থেকে প্রকাশ করে চলেছে ‘চমৎকার’ নামের পুস্তিকা—তাতে পুস্তকতালিকাও যেমন ছাপা হচ্ছে, তেমনই থাকছে প্রতিবার একটি বিশেষ বিষয়ে বেশ ক’টি নিবন্ধ। হারানোর ভয় কাটাতে তাকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ওয়েবসাইটে। কিন্তু সংরক্ষণের এই সুবিধা বর্তমানে অন্যত্র প্রায় অমিল, অতীতের প্রশ্ন তো ওঠেই না। আমরা আশা করব ভবিষ্যতে বইয়ের বিজ্ঞাপনের একটা ডিজিটাল আর্কাইভ করে কেউ অন্তত এ অসাধ্য সাধন করবেন।
বর্তমান সংখ্যার সঙ্গে নমুনা হিসাবে ইন্দ্রজিৎ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে ‘সি, সি, বসাক এণ্ড সন্স’-এর বইয়ের বিজ্ঞাপনের ১৬টি পাতা একটি পুস্তিকাকারে হুবহু প্রতিলিপি করে বিনামূল্যে বিতরণ করা হল।


